প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশে সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে অতীতে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের কারণে ক্রমেই বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ শোধের পরিমাণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারের ওপর চলতি অর্থবছরেও ঋণ পরিশোধের চাপ বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইআরডির তথ্যানুসারে, গত অর্থবছরে ৮৩২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ছাড় হয় ৮৫৭ কোটি ডলার। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৭৪ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ১ হাজার ২৮ কোটি ডলার ছাড় করা হয়েছিল। সে হিসাবে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি সাড়ে ২২ শতাংশ এবং অর্থছাড়ের পরিমাণ কমেছে ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার সিংহভাগই এসেছে ঋণ হিসেবে। বিপরীতে অনুদানের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। এ সময় দেশে ৩৮ কোটি ডলারের অনুদান এবং ৭৯৪ কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ এসেছে। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৫ কোটি ডলারের অনুদান এবং বিদেশী ঋণ এসেছিল ৯৮৯ কোটি ডলারের।
বিদেশী ঋণ ও অনুদান কমলেও গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে। এ সময় ৪০৯ কোটি ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার। এর মধ্যে ২৬০ কোটি ডলার আসল এবং ১৪৯ কোটি ডলার দিয়েছে সুদ হিসেবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ৩৩৭ কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২০২ কোটি ডলার আসল এবং ১৩৫ কোটি ডলার ছিল সুদ। এক বছরের ব্যবধানে সরকারের বিদেশী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ২১ শতাংশ।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধ করলেও বিদায়ী অর্থবছরে তা ৪ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে এ ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। কেননা গত অর্থবছরে বিদেশী ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে সুদ বাবদ ব্যয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে নতুন করে সহায়তার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি কমে গেছে অর্থছাড়। তবে সরকার যেসব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সেগুলোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে এলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাড়বে সহায়তার পরিমাণ।
উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ২৫২ কোটি ডলার ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) কাছ থেকে এসেছে ২০১ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ১৫৮ কোটি ডলার। রাশিয়ার কাছ থেকে ৬৭ কোটি ডলার এসেছে। ৫৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি)। চীন দিয়েছে ৪১ কোটি ডলার। ভারতের কাছ থেকে ১৮ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। তাছাড়া ৬৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা।
দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিগত সরকার বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নিয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। বেশ কয়েকটির কাজ এখনো চলমান। এরই মধ্যে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্পের বিদেশী ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সামনে এটি আরো বাড়বে।
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ধীরগতির জেরে বিদায়ী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে দুই দশকের সবচেয়ে কম। গত অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতেই ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকদিন কারফিউ জারি ছিল, বন্ধ ছিল সরকারি অফিস ও কাজ। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের ফলে অনেক প্রকল্প পরিচালকের খোঁজ মেলেনি। অনেক ঠিকাদারও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ফলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব ঋণ নেয়া হয়েছিল তার মধ্যে বেশকিছু ফেরত দেয়ার সময় হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকেই ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় নির্ভর করে। ফলে বাস্তবায়ন না হলে অনেক সময় সহায়তার অর্থ পাইপলাইনে থেকে যায়, ছাড় করা হয় না। দেশের রাজনৈতিক অবস্থার কারণে অর্থ ব্যয় কম হয়েছে, বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এ কারণে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি কমেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই অর্থছাড়ের পরিমাণও কমে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা যত বাড়বে তখন নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড়ের পরিমাণ দুটোই বাড়বে।’